যেকোনো টিউমারই আসলে কবরে তোলা মাটি
যে মানুষটা আজও বন্ধুদের বই পড়ার জন্য ধার দেয়, তার সঙ্গে আলাপ করতে ইচ্ছে করে আরও বেশি করে স্টুডিও থেকে ফেরার সময়, রাত্তিরে; যদিও এই ফেরার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। একটা বয়স অব্ধি ফেরার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানাও ছিল না, নির্দিষ্ট কোনো বালিশ কিংবা চাদর। তখন এই গোটা শহরটা তার ওম জড়িয়ে নিজেরই কোনো এক টিউমারে আমার মাথাটা রেখে ঘুম পড়িয়েছে। এখন যত দিন যায়, তত ঘুমের সঙ্গে নিজের অবিচ্ছেদ্য একটা বিএসএফ সম্পর্ক বুঝতে পারি। স্টুডিও থেকে ফেরার সময় যার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে, তাকে আমি চেহারায় চিনি না, মনে করি তার সঙ্গে আলাপ আমাকে মাতৃভাষার আদর দেবে, শৈশবের গন্ধ দেবে, ভুলে যাওয়া শব্দ দেবে। ভুলে যাওয়া শব্দেরাও তো আজ বিকল্প পেশায় যুক্ত। আর আমি নিজেও মাল্টিমিডিয়ার সাপ-সিড়ি খেলায়, কখন যে উঠছি, কখন যে নামছি। যেকোনো নম্বরের থেকে তাই নিজেকে দূরে রাখি যেকোনো ঘর। অভ্যেসে ভাইরাস পজিটিভ। নিজের মুখে মাস্ক পরাই, শব্দের মুখেও। নিজেকে শব্দদের থেকে দূরে রাখি। একটা শব্দকে আরেকটা শব্দের থেকেও। লিখলে অশান্তি বাড়ে।
ইন্টারনেটের অ্যালগোরিদমের জন্যই হোক বা চাকরির সাইড এফেক্টে, আমি নিজেও ভিডিওর দিকে একটু বেশি ঝুঁকে পড়েছি। মাথার ভিতর মেঘ, ফ্ল্যাশব্যাকের সেপিয়া টোনে ভাসতে থাকে। যে মানুষটা আজও বন্ধুদের বই পড়ার জন্য ধার দেয়, তাকে জিগ্যেস করতে ইচ্ছে করে তাক ও ধুলোর দর। আমি চিন্তার হেমন্তে কমা বসাই এবং আগামীদিনের জন্য কাজ স্টুডিও-ই বাকি রেখে বাড়ি ফিরে আসি। বুকের ভিতর রোজ রাত্তিরে একটা ট্রেন জংশন ছেড়ে যায়। যেন বা হুইসেলে জানান দিয়ে যায় বাড়ি ফিরলে কেউ বা ছেড়ে চলে যাবে। কোথায় যায় সেই ট্রেন? বুকের ভিতর এত যে লাইন পাতা, আমিই কি জানতাম কখনও! কানের তো অভ্যেস নেই, সে কেবল বাইরের কুঝিকঝিক শোনে। আমি বেকার উঁকি দিয়ে দেখি সব বন্ধুদের পিছনে ফেলে যাওয়া। রোজ রাত্তিরে এই ট্রেন যায়, যে ট্রেন যায়, সে কি ভারতীয় রেলের মতোই আবার ফিরেও আসে? সেই মানুষটা যে আজও বন্ধুদের বই পড়ার জন্য ধার দেয়, তাকে জিগ্যেস করব ভাবি, দিয়ে দেওয়া বই ফেরত কি এসেছে কখনও! আমার কোনও কারশেড নেই, স্মৃতি আছে। সেই স্মৃতির ভিতর আমি দেখি একটা লাটাই কেবল ঘুরেই চলেছে, ঘুরেই চলেছে, ওই ট্রেনের চাকারই মতন, আমার বাড়ি ফেরার উবেরের চাকারই মতন, অথচ তার কোনো ঘুড়ি নেই। আমি বাড়ি ফিরে আসি। পোর্টেবল এক টিউমারকে বালিশ ভেবে মাথায় রেখে ঘুমাতে যাই। সমালোচকের প্রিয় ঠিকানা এই ঘুম, আমার জাহাজের প্রিয় অ্যাঙ্কর।
স্বপ্নে বাদশাহ আসেন, পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ। ভেঙ্কটেশ ফিল্মসও আসে স্বপ্নে। আসেন স্বপ্নময়বাবু। যেকোনো টিউমারই আসলে কবরে তোলা মাটি, তাঁরা ফুল ছড়িয়ে দিয়ে যান। আমি চন্দ্রবিন্দু বলতে সিপিএম চিনতে শিখি। শব্দহীন এই স্বপ্নে সব কিছুই ঘটে যায় খুব নির্বিঘ্নে, শান্তিতে, কারণ আমি আজকাল আর লেখালেখি করি না। মঞ্চের উপর উইদাউট রিহার্সাল হেঁটে যাই। শরীরে আগুন ধরিয়ে, বরফে চুবিয়ে রাখি এই ওয়ার্কশপ। সর্প-রজ্জুর খেলায় এই আমার মস্ত বড় গিঁট।
Comments (0)
Rate this Article
How do you feel about this article?
Comments (0)
No comments yet
Be the first to share your thoughts!
Join the Discussion