Rik Amrit Archive

Member Privileges

10% Privilege Access
Boistack — Complete Digital Library
Anviksa — Classical Seminars & Courses
Sravanam — Master Audio Archive
ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ২ - পতঞ্জলির সংজ্ঞা ও তার যুক্তি
Bengali
Featured

ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ২ - পতঞ্জলির সংজ্ঞা ও তার যুক্তি

এই তপঃ-স্বাধ্যায়ের যুগলবন্দি নিছক যোগশাস্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ভারতীয় সাহিত্যেরও গভীরে প্রোথিত। বাল্মীকি রামায়ণের প্রথম শ্লোকেই আমরা দেখি, বাল্মীকিকে বর্ণনা করা হয়েছে "তপঃস্বাধ্যায়নিরতম্" বলে — তপঃ ও স্বাধ্যায়ে নিরত। আর সমগ্র রামায়ণ রচনার পশ্চাতে বাল্মীকির নিজের কোনো কর্তৃত্বাভিমান ছিল না; ঐতিহ্য অনুসারে তিনি নিমিত্তমাত্র, স্বয়ং ব্রহ্মার আশীর্বাদে আবিষ্ট হয়ে এই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। ফলে গ্রন্থের সূচনাতেই তপঃ ও স্বাধ্যায়ের উপস্থিতি, এবং সমগ্র রচনাকর্মটিই যেন বাল্মীকির নিজস্ব ঈশ্বরপ্রণিধান — এই সংযোগ কোনোভাবেই আকস্মিক মনে হয় না। বরং এ থেকে বোঝা যায়, তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বরপ্রণিধানের এই ত্রিবিধ ভাব ভারতীয় চেতনায় এতটাই সহজাত যে, তা শাস্ত্র থেকে কাব্যে, যোগ থেকে সাহিত্যে অনায়াসে সঞ্চারিত হয়ে গেছে।

মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রের সাধনপাদে ক্রিয়াযোগকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন —

তপঃস্বাধ্যায়েশ্বরপ্রণিধানানি ক্রিয়াযোগঃ॥ (যোগসূত্র ২/১)

তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান — এই তিনটি মিলে ক্রিয়াযোগ। পরবর্তী সূত্রে তিনি এর উদ্দেশ্যও স্পষ্ট করেছেন —

সমাধিভাবনার্থঃ ক্লেশতনূকরণার্থশ্চ॥ (যোগসূত্র ২/২)

সমাধির জন্য এবং ক্লেশ ক্ষীণ করার জন্য। লক্ষণীয় যে ক্রিয়াযোগ এখানে কোনো নিছক তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ফলাফলযুক্ত ব্যবহারিক সাধনপদ্ধতি।

কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে — তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান, এই তিনটিকে বহু ভাষ্যকার ও যোগী প্রধানত আত্মনির্যাতনমূলক পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এসেছেন — কৃচ্ছ্রসাধন, কণ্টকশয়ন, দীর্ঘ উপবাস, প্রখর রৌদ্রে দণ্ডায়মান থাকা। প্রশ্ন হলো, যোগশাস্ত্রে কি প্রকৃতপক্ষে এরূপ আত্মনির্যাতন বিহিত? এই প্রশ্নের মীমাংসার জন্য সাংখ্য-যোগ দর্শনের মূল কাঠামোয় ফিরে যাওয়া আবশ্যক।

সাংখ্য দর্শনে পুরুষ ও প্রকৃতির দ্বৈতবাদ স্বীকৃত — পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ, নিষ্ক্রিয় সাক্ষী; প্রকৃতি জড়, সক্রিয়, সমস্ত সৃষ্টির মূল, এবং সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ এই তিন গুণে গঠিত। মানুষের দুঃখের মূল কারণ পুরুষের এই ভ্রান্তি যে সে নিজেকে প্রকৃতি বলে মনে করে — এই অবিদ্যা থেকেই জন্ম নেয় পঞ্চক্লেশ: অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ। এই পঞ্চক্লেশ নাশের উপায় হিসেবেই পতঞ্জলি তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বরপ্রণিধান উত্থাপন করেছেন।

পতঞ্জলি স্বয়ং বলেছেন — কায়েন্দ্রিয়সিদ্ধিরশুদ্ধিক্ষয়াত্তপসঃ (যোগসূত্র ২/৪৩) — অশুদ্ধিক্ষয় হলে তপঃ দ্বারা শরীর ও ইন্দ্রিয়ের সিদ্ধি হয়। এখানে 'সিদ্ধি' শব্দটিই প্রমাণ করে যে তপঃ শরীরকে অসংবেদনশীল করে তোলা নয় — তা তমোগুণবৃদ্ধি হতো — বরং তপঃ সত্ত্বগুণবৃদ্ধির প্রক্রিয়া, যার ফলে শরীর-ইন্দ্রিয় আরও সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। গীতায় সাত্ত্বিক তপের যে বর্ণনা আছে — দেবতা-গুরু-ব্রাহ্মণপূজা, শৌচ, সরলতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা (গীতা ১৭/১৪-১৫) — সেখানেও 'সরলতা' শব্দটি লক্ষণীয়; তপের অর্থ আত্মনির্যাতন নয়, জীবনের জটিলতা পরিহার। জীবন সরল হলে আকাঙ্ক্ষা কমে, আকাঙ্ক্ষা কমলে রাগ-দ্বেষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ক্ষীণ হয় — এ কোনো বলপূর্বক দমন নয়, স্বাভাবিক পরিণতি।

তপঃ দ্বারা চিত্ত যখন স্থির ও স্বচ্ছ হয়, তখনই স্বাধ্যায় সম্ভব হয় — কারণ অস্বচ্ছ, রজঃ-তমোঽচ্ছন্ন চিত্তে আত্মপর্যবেক্ষণ অসম্ভব। পতঞ্জলি বলেছেন, স্বাধ্যায়াদিষ্টদেবতাসম্প্রয়োগঃ (যোগসূত্র ২/৪৪) — স্বাধ্যায় থেকে ইষ্টদেবতার সঙ্গে সংযোগ ঘটে। স্বাধ্যায়ের লক্ষ্য বিবেকখ্যাতি — পুরুষ ও প্রকৃতির ভেদজ্ঞান। পতঞ্জলি বলেন, বিবেকখ্যাতিরবিপ্লবা হানোপায়ঃ (যোগসূত্র ২/২৬) — অটল বিবেকখ্যাতিই ক্লেশনাশের উপায়। "আমি পুরুষ, প্রকৃতি নই" — এই জ্ঞান জাগ্রত হলে অবিদ্যা স্বতই বিলুপ্ত হয়, এবং অবিদ্যার বিলোপে অস্মিতাও বিলীন হয়, কারণ অস্মিতা হলো "আমি কর্তা, আমি ভোক্তা" এই অহংবোধ।

অবশেষে ঈশ্বরপ্রণিধান — সমস্ত কর্মফল ঈশ্বরে অর্পণ, কর্তৃত্বাভিমানের ত্যাগ। পতঞ্জলি বলেন, সমাধিসিদ্ধিরীশ্বরপ্রণিধানাৎ (যোগসূত্র ২/৪৫) — ঈশ্বরপ্রণিধান থেকে সমাধিসিদ্ধি হয়। যখন "আমি" সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়, তখনই সমাধি ঘটে, কারণ সমাধির একমাত্র বাধা অহং। এইভাবে তপঃ সত্ত্বগুণ আনে, স্বাধ্যায় আনে বিবেক, ঈশ্বরপ্রণিধানের পরিণামে অহংয়ের লোপ ঘটে — এবং এই ত্রিবিধ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল সমাধি তথা কৈবল্য।

এই তপঃ-স্বাধ্যায়ের যুগলবন্দি নিছক যোগশাস্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ভারতীয় সাহিত্যেরও গভীরে প্রোথিত। বাল্মীকি রামায়ণের প্রথম শ্লোকেই আমরা দেখি, বাল্মীকিকে বর্ণনা করা হয়েছে "তপঃস্বাধ্যায়নিরতম্" বলে — তপঃ ও স্বাধ্যায়ে নিরত। আর সমগ্র রামায়ণ রচনার পশ্চাতে বাল্মীকির নিজের কোনো কর্তৃত্বাভিমান ছিল না; ঐতিহ্য অনুসারে তিনি নিমিত্তমাত্র, স্বয়ং ব্রহ্মার আশীর্বাদে আবিষ্ট হয়ে এই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। ফলে গ্রন্থের সূচনাতেই তপঃ ও স্বাধ্যায়ের উপস্থিতি, এবং সমগ্র রচনাকর্মটিই যেন বাল্মীকির নিজস্ব ঈশ্বরপ্রণিধান — এই সংযোগ কোনোভাবেই আকস্মিক মনে হয় না। বরং এ থেকে বোঝা যায়, তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বরপ্রণিধানের এই ত্রিবিধ ভাব ভারতীয় চেতনায় এতটাই সহজাত যে, তা শাস্ত্র থেকে কাব্যে, যোগ থেকে সাহিত্যে অনায়াসে সঞ্চারিত হয়ে গেছে।

কিন্তু পতঞ্জলির যোগসূত্র মূলত সিদ্ধান্তপক্ষের গ্রন্থ — সেখানে কী করতে হবে বলা আছে, কীভাবে করতে হবে তার বিস্তারিত বিবরণ নেই। পতঞ্জলির দ্বিতীয় ইঙ্গিত পাওয়া যায় প্রাণায়াম-সূত্রে — তস্মিন্ সতি শ্বাসপ্রশ্বাসয়োর্গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ (যোগসূত্র ২/৪৯), আসনসিদ্ধি হলে শ্বাসপ্রশ্বাসের গতিবিচ্ছেদই প্রাণায়াম। এখানে পতঞ্জলি ইঙ্গিত করছেন যে ক্রিয়াযোগের মূল কৌশল প্রাণায়াম — কিন্তু কোন নির্দিষ্ট প্রাণায়াম, কতবার, কোন ক্রমে, এ বিষয়ে তিনি নীরব। এই শূন্যস্থানই পূরণ করেছে গুরুপরম্পরা — প্রতিটি যুগে গুরুবর্গ নিজ নিজ শিষ্যদের উপযুক্ত সাধনপক্ষের কৌশল প্রদান করেছেন। ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে এই যোগবিদ্যা তিনি পূর্বে বিবস্বান, মনু ও ইক্ষ্বাকুকে দিয়েছিলেন, কিন্তু কালক্রমে তা লুপ্ত হয়ে যায় (গীতা ৪/২)। এই লুপ্ত সাধনপক্ষই পুনরুদ্ধার করেন মহাবতার বাবাজী মহারাজ, এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা প্রদান করেন শ্রী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়কে।

Rate this Article

0.0 0 readers rated

Your response to this piece

Discussion (0)
No voices yet

Be the first to contribute to this discussion.

Join the conversation

Share your perspective
0 / 2000
Topoi

Explore related themes

Lectures & Talks

Lectures & Events

Live sessions, public lectures, and discussions exploring Indian knowledge systems and classical thought.

MAY 11 2026
Recent Talk
Seventh Global Oneness Festival

The Sublime and the Self: Shankaracharya's Aesthetic Thought

7:00 PM – 8:00 PM IST Online / Evening Session
MAR 24 2026
Recent Talk
Online Lectures – Agamic Studies & Classical Traditions

The Concept of 'RASA' in the Natya Sastra

2:30 PM – 3:30 PM IST Online

Explore past archives and recorded sessions across platforms.

Stay Connected

Occasional Notes

Receive reflections and insights on Indian Knowledge Systems—only when something new is written. No schedule, no excess.

Rare Essays Classical Thought Zero Noise

You may unsubscribe at any time. We respect your attention.


Warning: Cannot modify header information - headers already sent by (output started at /home/u483256323/domains/rikamrit.com/public_html/app/views/layouts/header.php:91) in /home/u483256323/domains/rikamrit.com/public_html/app/helpers/language_helper.php on line 21