প্রজাতান্ত্রিক কাঠামোয় তিনটি মূল স্তম্ভ। প্রশাসক, প্রশাসন আর প্রজা। মাথায় রাখতে হবে শব্দটা, প্রজাতান্ত্রিক। প্রজার জন্য, প্রজার দ্বারা, এবং একান্তই যা প্রজার। প্রশাসক এখানে সেবক, প্রজাই আসল। এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার, এই ব্যবস্থার উপর প্রজার আস্থা বাঁচিয়ে রাখার দায় নির্বাচন কমিশনের।
প্রজাতান্ত্রিক কাঠামোয় তিনটি মূল স্তম্ভ। প্রশাসক, প্রশাসন আর প্রজা। মাথায় রাখতে হবে শব্দটা, প্রজাতান্ত্রিক। প্রজার জন্য, প্রজার দ্বারা, এবং একান্তই যা প্রজার। প্রশাসক এখানে সেবক, প্রজাই আসল। এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার, এই ব্যবস্থার উপর প্রজার আস্থা বাঁচিয়ে রাখার দায় নির্বাচন কমিশনের।
কিন্তু প্রজা মানে শুধু ব্যক্তি নয়। প্রজা মানে সমাজ। আর ব্যক্তি এই সমাজের অঙ্গ, সমাজের উপরে নয়। আর ঠিক এখানেই হয় সব থেকে বড় ভুল। ব্যক্তিগত ভয়, হতাশা, কামনা, দুর্দশা, লোভ আমাদের সমাজ থেকে আলাদা করে দেয়। আর যারা ক্ষমতায় থাকতে চান, তারা এই বিচ্ছিন্নতাকে আরও বাড়িয়ে তোলেন। সমাজকে কঙ্কালসার করে ব্যক্তিকে একা দাঁড় করিয়ে দেন। তারপর আস্থার জায়গায় বসিয়ে দেন ভয়। সমাজের শাসন হয়ে যায় একজন মানুষের শাসন।
পশ্চিমবঙ্গে ঠিক এটাই হয়েছিল। প্রজার ভোট হয়ে গিয়েছিল একজনের বেঁচে থাকার লড়াই। ধাপ্পারাণী, তার পরিবারের, আর আই-প্যাক নামের একটি বেসরকারি সংস্থার। প্রশাসক হয়ে উঠেছিলেন প্রজার চেয়ে বড়।
কিন্তু এই উল্টো ব্যবস্থা যে চিরস্থায়ী নয়, এটাই বুঝিয়ে দেবার ভোট ছিল এটা। যেভাবে ২০১১ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ঔদ্ধত্য-এর সামনে জনগণের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এই ভোটও ছিল সেই ঘটনার পুনর্নিমানের সুযোগ। এই ভোটের মাধ্যমেই প্রমাণ করা গেছে যে প্রজা যেকোনো একজন মানুষের চেয়ে বড়, কোনো প্রশাসক তার প্রজার উপরে নয়। তাই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখানে আনুষঙ্গিক ছিল না, এটাই ছিল ভিত্তি।
আর যখন চেনা সিভিল সোসাইটি, বুদ্ধিজীবীরা, প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিগত স্বার্থে বিক্রী হয়ে গেল, তখন নিঃশব্দে জেগে উঠল অন্য শক্তি। USTHI-র মতো সংগঠন, এক ইউনাইটেড প্রাইমারি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন, কোনো হইচই ছাড়া যারা সাধারণ মানুষের মধ্যে একতা আর নির্ভীকতা তৈরি করল। হেডলাইনে এলেন না। কিন্তু এই সিস্টেমকে বাঁচিয়ে রাখার কাজ তারাই করলেন। এটাও ছিল প্রজার শক্তি।
কিন্তু এই ভোটের আসল নায়ক কোনো সংগঠন নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানও নয়। আসল নায়ক সেই সাধারণ ভোটার। যিনি বছরের পর বছর ভয়ের মধ্যে থেকেও, ভয় দেখানো সত্ত্বেও, বারবার বলা সত্ত্বেও যে তার ভোটে কিছু হবে না, ফলাফল আগে থেকেই ঠিক, তবুও বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। বোতাম টিপেছিলেন। সেই নিরুত্তাপ, নিঃশব্দ, একেবারে সাধারণ কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি একটি অসাধারণ কাজ করেছিলেন, প্রজাতন্ত্রকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন নিজের কাছে।
নির্বাচন কমিশন এইবারের ভোটে একটিও নিরপরাধ প্রাণের হত্যা না ঘটতে দিয়ে, যা আদতেই পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ইতিহাসে আগে অকল্পনীয় ছিল, আসলে একটি নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত করলেন। যে প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে ভোটে হিংসা ছিল স্বাভাবিক, সিপিএম-এর হাতে শুরু যা, সেই উত্তরাধিকারের আজ একটি সমাপ্তি ঘটল।
উস্থিকে ধন্যবাদ। নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ। আর ধন্যবাদ প্রতিটি সেই ভোটারকে যিনি বেরিয়েছিলেন।
রায় এখন রেকর্ডেড। যদি পরিবর্তন চেয়ে থাকেন, পরিবর্তন আসবে। যদি পুরনো প্রশাসককেই ফিরিয়ে এনে থাকেন, তাহলে সেটাও মাথা পেতে নিতে হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যও এটাই, শাসনও এটাই।
কিন্তু গণনার দিনটাই শেষ নয়। যে-ই জিতুক, কাজ থামে না। যে সচেতনতা মানুষকে ভোট দিতে বের করেছিল, সেটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জবাবদিহি একটা মরসুম নয়, এটা একটা অভ্যাস হওয়া চাই। একটা ভোটে প্রজাতন্ত্র ফেরে না। ফেরে ধীরে ধীরে, সেই মানুষদের হাত ধরে যারা চোখ ফেরাতে রাজি নয়। এটাই আসল কাজ। আর সেই কাজ শুরু হোক আজ সকাল থেকে।
Rate this Article
Your response to this piece
Discussion (4620)
Join the conversation
Share your perspective