Unlock Exclusive Benefits!

GET 10% OFF
Boistack - Your eBook Library
Anviksa - Premium Courses
Sravanam - Audiobook Collection
Bengali
Featured

হার মানতে শিখুন, মাননীয়া

লেখাটি লিখতে গিয়ে আমার ভীষণভাবেই শেক্সপীয়রের মার্গারেট চরিত্রটির কথা মনে পড়ছে। কেন পড়ছেহেনরি সিরিজ বা রিচার্ড থ্রি যারা পড়েছেন তাঁরা অবশ্যই অনুমান করতে পারবেন। মার্গারেটযিনি শূন্য থেকে উঠে এসে ইংল্যান্ডের রাজশক্তির কেন্দ্রে পৌঁছেছিলেনযুদ্ধ করেছিলেনরাজ্য চালিয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত তাঁর শত্রুর দরবারে এক অপ্রাসঙ্গিক ছায়ামূর্তি হয়ে ঘুরে বেড়াতেন। অতীতের গৌরব আঁকড়ে ধরেপরাজয় অস্বীকার করে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে এইবার সেই দৃশ্যই যেন পুনরাভিনীত হল।

ফিরে যাই একটু অতীতের দিকে। ইতিহাসের কাছে কিছু নির্মম অভিজ্ঞতার স্মরণ করতে চেয়ে। মনে পড়ে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কীসের বিরুদ্ধে লড়েছিলেনসিপিএমের ক্যাডার রাজের বিরুদ্ধে; সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে; বুথ দখলের বিরুদ্ধে; বিরোধীদের উপর শারীরিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে; রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের বিরুদ্ধে; সিঙ্গুরে কৃষকের জমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে; হত্যা, ধর্ষণ, জনগণের সামাজিক সুরক্ষার জন্য তাঁর সেই অদম্য লড়াই যে অন্যায্য ছিল না, একথা আমরা অস্বীকার করতে পারি কি? আমার তো বেশ মনে পড়ে, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সংসদে তাঁর সেই অ্যাগ্রেসিভ আচরণ, আজকের জেন জি-দের হয়ত তা জানার কথা নয়। সেই সমস্ত লড়াইয়ে মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল, এবং অনেক সম্ভাবনা নিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকারের জননেত্রী। বামফ্রন্টের জ্বালায় অতিষ্ঠ মানুষের প্রত্যুত্তর।

আর ২০২৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোগহুবহু একই তালিকা। ক্যাডার রাজএখন তৃণমূলের রঙে; সিন্ডিকেট, এখন কয়লাবালিগরু পাচারের নেটওয়ার্কে; বুথ দখলপদ্ধতি পরিবর্তিত হয়নিশুধু দলের পতাকা বদলেছে। এছাড়া বিরোধী কর্মীদের উপর হামলা,২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন বা ২০২১-এর ভোট পরবর্তী হিংসা তো এখনো মানুষের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। তদুপরি শেষ কয়েকবছর আইপ্যাক ও সিভিক ভলয়ান্টিয়ারদের কাজে লাগিয়ে যে প্যারালাল সরকার চলছিলতা তো মমতারাজের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির নতুন রূপ। বাম আমলের যে যন্ত্রে পিষ্ট হয়ে মানুষ একদিন বিদ্রোহ করেছিলসেই একই যন্ত্র যখন তিনি নিজে চালাতে শুরু করলেনমানুষ তাই আবার বিদ্রোহ করল। ইতিহাস এই পাঠ বারবার দেয়। মমতার ট্র্যাজেডি ঠিক এইখানেতাঁর বিজেপি নিধন যজ্ঞে একথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কোনও বৈশম্পায়ন ছিলেন না । 

বামফ্রন্টকে দুহাজার এগারো সালে যে শিক্ষাটা মানুষ দিয়েছিল, তা ছিল ১৯৭৭ এ কংগ্রেসকে দেওয়া শিক্ষার থেকে বড়। কিন্তু এইবারের শিক্ষা দুহাজার এগারোর চেয়ে অনেক বড়, অনেকটাই বড় কেবল ভোট বা আসন প্রাপ্তির নিরিখে নয় (তৃণমূল ২০১১ সালে পেয়েছিল ১৮৪ টা আসন), বরং একারণেও, যখন মমতার বিরুদ্ধে বিরোধীদের আদতেই মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে কোনও নাম ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের ভোটের সংস্কৃতি কিন্তু এমন নয়। মানুষ আইকন ভালোবাসেন এখানে, ভালোবাসেন অপশন। ভোটের ময়দানে পশ্চিমবাংলার জনগণ নিজেরা লিডার বেছে নেওয়ার পরিশ্রমটুকু করতে আগ্রহী নন, এমন বদনামই আছে। সেখানে মমতার বিরুদ্ধে মানুষজন ভোট দিয়েছেন নিজের লিডার নিজে বেছে নিয়ে, যেখানে বিরুদ্ধ কোনও রাজনৈতিক দল মানুষের সামনে কোন লিডার তৈরি করে তুলে দেয়নি। কারণ এতদিন সবার একটাই বিশ্বাস ছিল, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জননেত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতন জননেতা কোনও দলেই নেই।    

ফুটবলের লিগগুলোতে আমরা হোম ম্যাচ-অ্যাওয়ে ম্যাচের কথা জানি। রাজনীতিতে এইরকম দৃষ্টান্ত সহজে মেলে না। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু-মমতার লড়াই যদি শুভেন্দুর ক্ষেত্রে হোম ম্যাচ ও মমতার ক্ষেত্রে অ্যাওয়ে ম্যাচ হয়ে থাকেতাহলে ২০২৬-এ এসে তা-ই হয়েছে উল্টো। মমতার হোম ম্যাচশুভেন্দুর অ্যাওয়ে। শুভেন্দু দুইবারেই জয়ী। মধুর হোক বা কটু এই সত্য আমাদের এবার মেনে নিতেই হবে যে শুভেন্দু অধিকারীই জানেন মমতাকে হারানোর কৌশল।

শুভেন্দু জিতলেন কীভাবেএকবার নয় দুইবারসে আগামীদিনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের গবেষণার বিষয় হোকতাতে আপত্তি নেই। কিন্তু এই পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী এমন এক নাম হয়ে থেকে যাবেন যিনি একবার নয়দুইবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের কাণ্ডারী। ২০১১ সালে মমতার ক্ষমতায় আসার পিছনে হাজার এক কারণের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই মানুষটি সেই মুহূর্তে মমতার অনুজঅধিকারী পরিবারের বড় সন্তানযিনি সিপিএমের ঘাঁটি নন্দীগ্রামে সিপিএমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আর আজ তিনিই তাঁর বিপরীতে দাঁড়িয়েমমতার নিজের ঘরের মাঠেতাঁকে বলে বলে নাস্তানাবুদ করলেন।

কিন্তু মমতা হারলেন কেন? কী সেইসব দৃশ্যমান কারণ যা এই পরাজয়কে অনিবার্য করে তুলেছিল। স্থায়ী কর্মসংস্থানের প্রশ্নে তাঁর সরকার ব্যর্থ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা নিজের রাজ্যে কাজ না পেয়ে ভিন রাজ্যে যাচ্ছেন, নারীর কোনও সুরক্ষা নেই যে ছবিটা লক্ষ্মীর ভান্ডারের বিজ্ঞাপনের আড়ালে ঢাকা যায় না। ওয়াকফ আন্দোলনে মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে যে রাজনৈতিক মিথ্যাচার হয়েছেতা তাদের একাংশকেও বিভ্রান্ত করেছে। আর সরকারী কর্মচারীদের উপেক্ষা, তাদের সংগঠনের প্রতি প্রায় রাস্তার কুকুরদের মতন বিদ্রূপ। তাদের ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করা। এমনকি নিজের পুলিশ দিয়ে তিনি তাদের উপর লাঠি চার্জও করিয়েছেন বেশ কয়েকবার। 

আর সবচেয়ে বড় ক্ষতটি হয়েছিল ভোটের ঠিক আগে। সেই মন্তব্যযেখানে বলা হয়েছিলএকটি সম্প্রদায় যদি এককাট্টা হয় তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠকে কয়েক মুহূর্তেই শেষ করে দিতে পারে। এই একটি বাক্য বহু বছরের রাজনৈতিক পুঁজি মুহূর্তে ধ্বংস করে দিয়েছে। মানুষকে ভয় দেখিয়ে ভোট পাওয়া যায়কিন্তু ভয় পাওয়া মানুষ যখন ভোটবাক্সের সামনে একা দাঁড়ায়তখন সে সেই ভয়কেই ভোট দেয়, ভয় দেখায় যে তাঁর হাত থেকে নিজের সুরক্ষার জন্য। নির্বাচন কমিশনের কাজ ছিল ঠিক এখানেই। তাঁরা মানুষকে নির্ভয়ে ইভিএম-এর সামনে দাঁড় করাতে পেরেছেন। ভোট ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছেন। এতদিন যাদের কাছে ছিল ভাতার টাকা,কিন্তু ছাপ্পা ভোটের গেরোয় ছিল না ভোট দানের অধিকার। ভোট দানের সুযোগ পেয়ে তাই তাঁরা নির্বাচন করেছেন মুক্তি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত এই ভয়ের পরিবেশ থেকে। এই সহজ সমীকরণটি তিনি বুঝলেন নাবা বুঝতে চাইলেন না। এর পিছনেই যুক্তি হিসেবে রয়েছে তাঁর ভোটে হারার পিছনের আসল অদৃশ্য কারণটি। তিনি হয়ত ভেবেছিলেন, এই ক্ষমতার জন্য আসলেই তাঁর কোনও জবাব দেওয়ার দায় নেই। 

আমার ধারণা শেক্সপীয়র এই কথাটি বুঝেছিলেন আমাদেরও আগে এবং যেকোনও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের চেয়ে অনেক গভীরভাবে। ম্যাকবেথেরাজহত্যার পরের রাতে যখন ম্যাকবেথ নিজেই ভয়ে ভেঙে পড়েছেনতখন লেডি ম্যাকবেথ তাঁকে ঠান্ডা গলায় বলেছিলেন — "একটু জল দিয়ে হাত ধুয়ে ফেললেই যথেষ্ট"। ক্ষমতা একবার দখল করে নিলে তারপর শুধু তা ধরে রাখতে হয়। যা হয়ে গেছে তা ধামাচাপা দেওয়া যায়, ব্যাখ্যা করা যায়, পাল্টা আক্রমণে ভুলিয়ে দেওয়া যায়।

কিন্তু পঞ্চম অঙ্ক আসে। যখন লেডি ম্যাকবেথকে দেখা যায় ঘুমের মধ্যে উঠে অন্ধকারে হাঁটছেনদুই হাত একসঙ্গে ঘষছেন বারবার — যে রক্তের দাগ আর নেইসেই দাগ মোছার চেষ্টায়। যাওঅভিশপ্ত দাগ, মুছে যাও”, এবং তারপর সেই অসহায় প্রশ্ন— “এই হাত কি কোনোদিন পরিষ্কার হবে না?” যে চিকিৎসক তাঁকে দেখছিলেনতিনি বুঝেছিলেন এই রোগের ওষুধ তাঁর কাছে নেই। দাগটা চামড়ায় নয়বিবেকে। আর বিবেকের দাগ অস্বীকারে মোছে নাপাল্টা অভিযোগে মোছে না।

আজ পনেরো হাজার ভোটে নিজের কেন্দ্রে হারার পর মাননীয়া বললেনএকশোরও বেশি আসন "লুট" হয়েছে। নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট। কেন্দ্র ষড়যন্ত্র করেছে। হয়তো কিছু অভিযোগের ভিত্তি আছে। জানি না আদৌ আছে কিনা। কিন্তু যখন ২০৫টি আসন বিজেপি জেতেযখন ৪৬ শতাংশ ভোট তাদের পক্ষে যায়তখন শুধু আর "লুট" বলে পার পাওয়া যায় না। মানুষ ভোট দিয়েছেন। এটা মানতে হবে।

কাউকে কাউকে দেখলাম এই ভোটকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে। কেউ বলছেন বিরোধী ভোটের কনসলিডেশনকেউ বলছেন হিন্দু ভোটের মেরুকরণকেউ বলছেন বাম ভোটের স্যুইং। শুভেন্দু নিজেই বলেছেনভবানীপুরের সাতাত্তর নম্বর ওয়ার্ডের সমস্ত মুসলিম ভোট তৃণমূল পেয়েছেতাঁকে কোনো মুসলিম ভোট দেননিঅথচ ওই বিধানসভার সিপিএম-এর প্রায় দশ হাজার হিন্দু ভোটও তাঁর। কিন্তু গোটা রাজ্যে তাঁর দলের, আসনের নিরিখে জেতার সংখ্যা, তাঁরই পূর্ব প্রত্যাশাকে এভাবে বিপুল পরিমাণে ছাপিয়ে যায়তখন সমস্ত বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে উঠে একটাই সত্য পড়ে থাকে যে এই ভোট মানুষ দিয়েছেন। হিন্দুমুসলিমবামপন্থীপ্রতিষ্ঠান-বিরোধী এই সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটা বড় অংশের মানুষ বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন। এই সত্য অস্বীকার করা মানে মানুষকে অস্বীকার করা। 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি অসাধারণ রাজনৈতিক জীবন যাপন করেছেন। ২৯ বছর বয়সে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে যে মেয়েটি সংসদে প্রবেশ করেছিলেনএকা হাতে কংগ্রেস ছেড়ে দল গড়েছিলেনসিঙ্গুরে অনশনে বসেছিলেনচৌত্রিশ বছরের বাম দুর্গ ভেঙে দিয়েছিলেন, এই কৃতিত্ব কেউ কেড়ে নিতে পারবে না তাঁর কাছ থেকে। ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম থাকবে। কিন্তু মহত্ত্বের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয় প্রস্থানেপ্রবেশে নয়। নেলসন ম্যান্ডেলা এক মেয়াদ শেষে চলে গেলেন। অটলবিহারী বাজপেয়ী হারের পর নিঃশব্দে সরে দাঁড়ালেন। এঁরা ইতিহাসে বড় হলেন কারণ শেষটা সুন্দর ছিল। আজ মমতা যদি বলতেন, "মানুষের রায় মাথায় নিলামপশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ধন্যবাদ",তাহলে ইতিহাস তাঁকে আরও উঁচুতে রাখত। বদলে তিনি বেছে নিলেন অস্বীকারের পথ। অভিযোগের পথ। মার্গারেটের পথ।

হার মানা দুর্বলতা নয়মাননীয়া। হার মানা মানে মানুষকে মানা। আর যিনি মানুষের কথা বলে রাজনীতিতে এসেছিলেনতাঁর কাছে এটুকু প্রত্যাশা করা কি খুব বেশি? ইতিহাস আপনার উত্থানের কথা মনে রাখবে। কিন্তু প্রশ্ন হল প্রস্থানের কথাটাও কি মনে রাখবেনাকি শুধু এই অস্বীকারের দৃশ্যটাই শেষ ছবি হয়ে থাকবে? ইতিহাসও যে বিবেকের মতোই — কিছুই ভোলে না। 

Rate this Article

0.0 0 readers rated

Your response to this piece

Discussion (0)
No voices yet

Be the first to contribute to this discussion.

Join the conversation

Share your perspective
0 / 2000
Topoi

Explore related themes

Lectures & Talks

Upcoming Events

Join live sessions, public lectures, and talks exploring Indian knowledge systems, philosophy, and classical thought.

Past Talks (3)
A Federation of Temperaments: How Bharata Mapped Indian Culture Through Pravrttis Online Lecture Series – An Introduction to Cultural Studies
Jul 13, 2026
The Sublime and the Self: Shankaracharya's Aesthetic Thought Seventh Global Oneness Festival
May 11, 2026
The Concept of 'RASA' in the Natya Sastra Online Lectures – PG Diploma in Agamic Studies & Indian Knowledge Systems
Mar 24, 2026