জন্মাষ্টমী স্পেশাল: রাম ও কৃষ্ণ - মর্যাদা ও লীলার দ্বান্দ্বিকতা - Rik Amrit

জন্মাষ্টমী স্পেশাল: রাম ও কৃষ্ণ - মর্যাদা ও লীলার দ্বান্দ্বিকতা

Listen to this article

Enjoy hands-free reading with our audio player

3 min listen Multiple voices available
Ready to play
Audio Controls
Ready to play

কৃষ্ণ ‘কর্ষতে ইতি কৃষ্ণ’ অর্থেও প্রযুক্ত হয়। অর্থাৎ যিনি আকর্ষণ করেন। যোগভাষ্যে তিনি আজ্ঞাচক্রের অধিষ্ঠাতা। মণিপুর চক্রে আটকে যাওয়া অর্জুনকে আকর্ষণ করে টেনে তোলেন উর্ধে। গীতার সারমর্ম যোগদর্শনে এই।

জীবনকে দুটি ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে ভাগ করে দেখা যেকোনো ধর্মীয় দর্শনের এক স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। উদাহরণ হিসেবে যদি আমরা গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর এমনকি দশনামী আস্তিক সন্ন্যাস পরম্পরার দিকে দেখি, তাহলে আমরা লক্ষ্য করব যে জীবনের বাস্তবিকতায় তাঁরা খুশি নন, বরং তাঁদের সত্য এক অন্য জগতের কথা বলে। এই জীবন দুঃখময়, এই জগত মায়া, এই সার। কিন্তু সামগ্রিকভাবে জীবনবিমুখ ভারতীয় দার্শনিক ইতিহাসে শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র ব্যতিক্রম হিসেবেই ঐতিহাসিকের চোখে উপস্থিত হন। সে মহাভারত হোক কিংবা শ্রীমদ্‌ভাগবতম্‌, পারম্পরিক এবং প্রচলিত ধ্যানধারণাকে ভেঙে ফেলাই তাঁর কাজ। অপ্রত্যাশিত ভাবে যিনি সমাজের যাবতীয় নিয়ম-নীতিকে বারবার চ্যালেঞ্জ করার স্পর্ধা দেখান, তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করেন, তাকেই আমরা ইতিহাসে পূর্ণাবতার বলে মেনে নিচ্ছি। সেক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে শাসক যে শ্রীরামকে আদর্শ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন তাঁর কিন্তু পূর্ণাবতারের স্বীকৃতি নেই। তিনি খণ্ড। অবতারের ধারণা অবশ্য আমরা যারা ফ্যাকচুয়াল ইতিহাসে বিশ্বাস করি, যাদের জীবনে ভক্তি একটু কম, তাদের কাছে ততটা মূল্য রাখে না, তবু ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে বা মানব হিসেবে এঁদের কাজ ও কাজের মূল্যায়ন সহৃদয়ের, রসিকের মনের অবস্থান্তর করতে সক্ষম এ নিয়ে সন্দেহ থাকার কোনও অবকাশ নেই।

 

রামকে আমরা চিনি মর্যাদা-পুরুষোত্তম হিসেবে, আর কৃষ্ণ লীলা পুরুষোত্তম। পুরুষোত্তম হিসেবে শ্রী বিষ্ণুকেই উল্লেখ করা হয়ে থাকে। আমরা যদি ঋকবেদের পুরুষ-সুক্ত থেকে উদাহরণ নিই তাহলে পরম পুরুষের ধারণা সম্বন্ধে মনের যাবতীয় মেঘ কেটে যায়, এছাড়া শ্রীমদ্ভগবতগীতার পঞ্চদশতম অধ্যায়-এ কৃষ্ণ স্বয়ং নিজেকে 'আমিই সেই পুরুষোত্তম’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। বলা বাহুল্য, এই ‘আমি’ ব্যক্তি আমি নয়, বরং 'আমি’রূপ চৈতন্য। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বললে, ‘বড় আমি’। রামতাপিনী উপনিষদে পরম পুরুষ হিসেবে শ্রীরাম উল্লিখিত, এছাড়া বিষ্ণুসহস্রনামে তো পুরুষোত্তম হিসেবে বিষ্ণুর উল্লেখ আছেই। যদিও এগুলি পরবর্তী সময়ের রচনা, তাই উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে প্রাথমিক বা দ্বিতীয় কোনও তথ্য হিসেবে না ধরাই শ্রেয়। এখন বিষ্ণুর অবতার হিসেবে মর্যাদা রামের সীমা। তিনি ধর্মের পালন করতে গিয়ে কখনওই মর্যাদার সীমানা অতিক্রমণ করবেন না এটাই স্বাভাবিক। চারিত্রিক এই বৈশিষ্ট্যই রামকে বেশ খানিকটা প্রেডিক্টেবল করে তোলে। ঘটনা বিশেষে আমরা আন্দাজ করতে পারি রামের প্রতিক্রিয়া ঠিক কী হতে পারে। যে কারণে উত্তর কাণ্ডের প্রক্ষিপ্ত ঘটনাও আমাদের কাছে বেশ যুক্তিযুক্ত বলে প্রতিভাত হয়। কে জানে, হয়ত তাইই পৃথিবীতে কেবল রামায়ণের সংখ্যা দুশোর বেশি (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আমরা আজকের এই আলোচনায় বাল্মীকি রামায়ণকেই বিষয় হিসেবে ধরেছি)। কৃষ্ণের ক্ষেত্রে এই কথাটি খাটে না। রামের মতনই তিনিও ধর্ম সংস্থাপনের জন্য সংকল্পবদ্ধ, কিন্তু তাঁর কোনও সীমানা নেই। তাঁর কাছে সবটাই খেলা, যাকে আমরা লীলা বলে চিহ্নিত করেছি। রামের বিহ্বলতা তাঁর মধ্যে নেই। রামকে আমরা পিতা-পুত্র-ভ্রাতা-পতি সমস্ত সম্পর্কে অতিমাত্রায় আবেগপ্রবণ দেখি, কিন্তু তেরো-চোদ্দ বছর বয়সে যখন কৃষ্ণ প্রথম তাঁর জন্মদাতা-জন্মদাত্রীর সঙ্গে আলাপ করেন, তাঁর মধ্যে এমন কোনও বিহ্বলতা দেখা যায় না। এমনকি নন্দ-যশোদাকে নিয়ে তাঁর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার কোনও উদাহরণ নেই। তেমনই কোনও আবেগ আমরা দেখতে পাই না, অভিমন্যুবধের পর। ধর্মবিরুদ্ধ আচরণে প্রিয় মানুষদের থেকে সরে যাওয়ার উদাহরণ বরং আমরা পাই মৌষলকাল পর্বে। ডঃ এস এল ভৈরপ্পা তাঁর উপন্যাস ‘পর্ব’-এ বিদূরের মুখ দিয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে খুব সুন্দর একটি কথা বলিয়েছেন, যার অনুবাদ করলে খানিকটা এরকম দাঁড়ায় "কৃষ্ণ সম্বন্ধে আপনার ধারণা সর্বৈব ভুল। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যে, যদি যুদ্ধক্ষেত্রে পাণ্ডবেরা মারাও যান, তাহলে হয় কুন্তী নয় দ্রৌপদীকে রাণী বানিয়ে তিনি রাজ্য পরিচালনা করাবেন।” একজন অভিনেতা হিসেবে যখন কৃষ্ণ চরিত্র বিশ্লেষণ করতে বসি, তখন এরকমই কিছু অনুভব হয়।

 

কৃষ্ণ কথার একটি প্রচলিত অর্থ কালো। অন্ধকার। মহাভারতের কবি কৃষ্ণ চরিত্রের রহস্যময়তার প্রতীক হিসেবে এই নাম ব্যবহার করেছেন কিনা জানি না। আবার কবির নিজের নামও কৃষ্ণ। কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস। বেদান্তের পাঠ বাসুদেব কৃষ্ণ গ্রহণ করেছিলেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাসের কাছেই। সে দিক দিয়ে মহাভারতে ভীষ্ম ও বেদব্যাসের দার্শনিক যে মতবিরোধ তার অবসানও, ভীষ্মের মুখ দিয়ে কৃষ্ণকে ‘নরনারায়ণ’ আখ্যায়িত করার মধ্যে দিয়ে মেটে। কৃষ্ণ ‘কর্ষতে ইতি কৃষ্ণ’ অর্থেও প্রযুক্ত হয়। অর্থাৎ যিনি আকর্ষণ করেন। যোগভাষ্যে তিনি আজ্ঞাচক্রের অধিষ্ঠাতা। মণিপুর চক্রে আটকে যাওয়া অর্জুনকে আকর্ষণ করে টেনে তোলেন উর্ধে। গীতার সারমর্ম যোগদর্শনে এই।

 

রামের জন্ম উত্তরায়ণে, দিনের আলোয়। বসন্ত ঋতু, শুক্লপক্ষ, চৈত্রমাস। কৃষ্ণ জন্মেছেন দক্ষিণায়নে, মধ্যরাত। ভাদ্র মাসের ভরা বর্ষায়, কৃষ্ণ পক্ষে। রাজ্যের উত্তরাধিকার মাথায় নিয়ে বংশের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে রামের আগমণ ছিল রাজ্যবাসীর কাছে উৎসব। কৃষ্ণ দেবকীর কনিষ্ঠ সন্তান, মৃত্যুশঙ্কা মাথায় নিয়ে জন্মেছেন কারাগারে। সে রাত্রি ঝড়ের। সে রাত্রি মথুরাবাসীর কাছে বিভীষিকার। তাঁদের বেড়ে ওঠার মধ্যেও পার্থক্য যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। রাজপ্রাসাদের প্রাচুর্য্যের মধ্যে রামের অভাব কী! কৃষ্ণের ক্ষেত্রে অভাবকেই বরং নিয়তি বলে মনে হয়। ঠিক এতটাই বিরোধাভাষ দুজনের। রামায়ণের যুদ্ধ শেষে, রাম যুদ্ধজয় নিয়ে গর্ব বোধ করতে পারেন, তাঁর অবকাশও পান। অথচ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর কৃষ্ণের কপালে জোটে অভিশাপ, গান্ধারীর। পুরুষোত্তম যিনি জন্ম নেবেন অভিশাপ মাথায় করে(যদু ও তাঁর বংশের প্রতি যযাতির অভিশাপ), মৃত্যুও নির্ধারিত হবে তাঁর অভিশাপের দ্বারাই, সামান্য এক ব্যাধের তীরে। সেপ্টিকে? এই আপনার ভগবান! পূর্ণাবতার!

 

তাহলে কী তাঁকে পূর্ণ করে? এই প্রশ্নের উত্তরে হয়ত একটা কথাই উঠে আসে, 'বৈরাগ্য’। রামের মধ্যে যা নেই। জীবনের শত বাধা, বিপত্তি যাবতীয় বিপদের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে তিনি নাচতে পারেন উদ্দাম। কালসর্পের ফণায় উঠে তিনি নাচেন, গোপিনীদের সঙ্গে রাসের আয়োজনে তিনি নাচেন, লৌকিকের যাবতীয় দ্বৈততাকে স্বীকার করে, অলৌকিক হয়ে ওঠে তাঁর সেই নাচ। ইতিহাসের অন্যান্য পুরুষের কাছে এমন নাচ প্রত্যাশিত নয়। বুদ্ধ নাচেন না। মহাবীরও না। আচার্য শঙ্কর? তিনিও না! যীশু খ্রিষ্টের কোনও হাসিমুখ ছবি আমরা শিল্পীর কল্পনায় কখনও দেখেছি কি? মনে পড়ে না। এই নাচ, এই ক্রীড়া তাঁর লীলা। গীতায় কৃষ্ণ তাই যেন বারবার অর্জুনকে মনে করান, জন্ম বা মৃত্যু মঞ্চে প্রবেশ ও প্রস্থানের চেয়ে বেশি কিছু নয়। রামকে আমরা আদর্শ চরিত্র হিসেবে পাই রামায়ণে, মহাভারতে বা শ্রীমদ্ভাগবতম্‌-এ কৃষ্ণ সেখানে যেন অভিনেতা। অধ্যাত্মে শিব নটরাজ হলে আধিভৌতিকে, জগৎনাট্যে কৃষ্ণই নটবর।   
Comments (0)

Rate this Article

0.0 (0 ratings)
How do you feel about this article?
Comments (0)
💬

No comments yet

Be the first to share your thoughts!

Join the Discussion
0/1000 characters
Page-Specific Footer Example